
রংপুর মহানগরীর মডার্ন মোড়ে টাকা সংগ্রহকে কেন্দ্র করে তৃতীয় লিঙ্গ ন্যায় অধিকার সমিতির রংপুর জেলা সভাপতি আনোয়ারা ইসলাম রানী ও মিঠাপুকুর উপজেলা সভাপতি মারুফা ইসলাম মিতুর গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় মডার্ন মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুই গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি, হাতাহাতি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং তালি দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পরে রানীর বিরুদ্ধে সরকারি অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি বরাদ্দের জমি এককভাবে ভোগদখল, তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের নির্যাতন ও মামলা দিয়ে হয়রানিসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে মডার্ন মোড়ে বিক্ষোভ করেন মিতু গ্রুপের সদস্যরা। রাত ১০টার দিকে তারা মডার্ন মোড় থেকে মিঠাপুকুরের উদ্দেশে চলে যান।
মিতু গ্রুপের সদস্যদের অভিযোগ, গত প্রায় ছয় মাস ধরে রানী ও তার লোকজন তাদের মডার্ন মোড়ে টাকা সংগ্রহে বাধা দিয়ে আসছেন। এতে অর্ধশতাধিক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ আর্থিক সংকটে পড়েছেন। টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিলেই তাদের ওপর হামলা, শারীরিক নির্যাতন ও মামলা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তাদের আরও অভিযোগ, রানী সরকারি বিভিন্ন অনুদানের অর্থ নিজের ভোগ-বিলাসে ব্যয় করেছেন এবং সরকার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য যে জমি বরাদ্দ দিয়েছে, সেটিও তিনি এককভাবে ভোগ করছেন। প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশ করে এসব করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত মিঠাপুকুর উপজেলা সভাপতি মারুফা ইসলাম মিতু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা ‘গুরুমার সম্পত্তি’ হিসেবে মডার্ন মোড়ে টাকা সংগ্রহ করতেন। এর বিনিময়ে রংপুর জেলা সভাপতি আনোয়ারা ইসলাম রানীকে প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা করে দেওয়া হতো। তবে ২০২১ সালে রানীর লোকজন তাঁদের টাকা সংগ্রহে বাধা দিলে বিষয়টি নিয়ে স্ট্যাম্পে লিখিত সমঝোতা হয়।
মিতুর দাবি, ওই সমঝোতার সময় সমিতির পক্ষ থেকে আনোয়ারা ইসলাম রানীকে ১৪ ভরি সোনা দেওয়ার বিনিময়ে আজীবনের জন্য মডার্ন মোড়ে টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব নেওয়া হয়। এরপর তাঁরা সেখানে টাকা সংগ্রহ করে ৪৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন।
মিতু আরও অভিযোগ করেন, আনোয়ারা ইসলাম রানী তার ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তাদের মডার্ন মোড়ে টাকা সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়েছেন। তাদের হুমকি, শারীরিক নির্যাতন ও মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার, মহানগর পুলিশ কমিশনারসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেও কার্যকর ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন মিতু।
তিনি বলেন, টাকা সংগ্রহ করতে না পারায় ৪৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ অবস্থার প্রতিবাদে তারা মডার্ন মোড়ে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মডার্ন মোড়ে টাকা সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
অন্যদিকে, রানী গ্রুপের সদস্য সোনালী রানী বলেন, ‘রানী আর মিতু আপার মধ্যে কী আছে, মডার্ন মোড়ের কালেকশন নিয়ে তাদের কী দেনা-পাওনা আছে—এটা বসে সমাধান করা উচিত। কিন্তু আজকে যে ঘটনা ঘটলো, এটা খুব খারাপ হয়ে গেল।’
অভিযোগের বিষয়ে তৃতীয় লিঙ্গ ন্যায় অধিকার সমিতির রংপুর জেলা সভাপতি আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, ‘আমরা এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, রংপুর সিটি করপোরেশনে শুধুমাত্র সিটি করপোরেশনে বসবাসকারী হিজড়ারা টাকা আদায় করবেন। মিঠাপুকুর উপজেলার হিজড়ারা মিঠাপুকুর এলাকায় টাকা আদায় করবেন। সে কারণেই তাদের বাধা দেওয়া হয়েছে।’
মডার্ন মোড়ের টাকা সংগ্রহ নিয়ে কোনো দেনা-পাওনা থাকলে বৈঠকের মাধ্যমে সমাধানের কথা জানিয়ে রানী বলেন, ‘তারা যদি আমার কাছে টাকা পায় তাহলে বৈঠক করে সেটা করতে হবে। তারা টাকা পেলে আমি দেব। আর আমি টাকা পেলে আমি নেব।’
রোববারের ঘটনার বিষয়ে রানী বলেন, এটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। তিনি তার লোকজনকে সংঘর্ষে না জড়ানোর জন্য নিষেধ করেছিলেন বলেও দাবি করেন।
সরকারি অনুদান আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, ‘সরকারি অনুদানের কোনো টাকা আমি আত্মসাৎ করিনি। সরকার নীলকণ্ঠে যে ২০ শতক জমি বরাদ্দ দিয়েছে, এটার শুধু বাউন্ডারি ওয়াল করতেই আমার ২০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আর সরকার অনুদান দিয়েছে মাত্র ৭-৮ লাখ টাকা। বাকি সব টাকা আমার ব্যক্তিগত।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওখানে হিজড়ারা থাকতে চায় না। মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জের হিজড়ারা যদি সেখানে থাকতে চায়, তারা আসতে পারে।’
তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও অস্বীকার করেন রানী। তিনি বলেন, ‘কারও ওপর প্রভাব বিস্তার করা কিংবা কোনো হিজড়াকে শারীরিকভাবে নির্যাতন আমি কখনোই করিনি। যদি আমি কাউকে নির্যাতন করে থাকি, তাহলে আমার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
নিজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগের বিষয়ে রানী বলেন, বিষয়টি তিনি জানেন না এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাকে জানানো হয়নি। তবে রোববার তাজহাট থানার ওসি তাকে জানিয়েছেন, দুই পক্ষকে বসিয়ে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তাজহাট থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মিতু গ্রুপ থানায় জিডি করতে এসেছিল। আমরা তদন্ত করে জিডি গ্রহণ করব। পরে দুই পক্ষই মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল। আমরা তাদের বুঝিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। দুই পক্ষকে একসঙ্গে বসে এ বিষয়ে সমঝোতা করে দেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, আনোয়ারা ইসলাম রানি রংপুর ৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন ২০২৪ সালে। ২০২৬ এ নির্বাচনে অংশ নিলেও শেষ মুহূর্তে সরে দাড়ান।