• সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:১৩ পূর্বাহ্ন

ম্যাচের কাঠি ও রেশমি সুতায় দুর্গাপ্রতিমা, দেখতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত : রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

সংবাদটি সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন...

আকাশে শরতের মেঘ, মাঠে কাশফুলের দোলা। এরই মধ্যে কানে আসছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা। পূজা সামনে রেখে সাতক্ষীরার মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে চলছে শেষ সময়ের প্রস্তুতি। কোথাও বাঁশ-খড়ের কাঠামো, কোথাও মাটির প্রলেপ, আবার কোথাও প্রতিমার মুখাবয়ব ও অলংকারে চলছে নিখুঁত কারুকাজ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমাশিল্পীরা।

তবে এবারের দুর্গোৎসবে সাতক্ষীরার প্রতিমা তৈরিতে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি করেছে সদর উপজেলার ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুর শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মণ্ডপের একটি প্রতিমা। মাটির অবয়বের ওপর দেড় লাখের বেশি ম্যাচের কাঠি ও ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। সাধারণত আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহৃত ম্যাচের কাঠিই এখানে শিল্পীর হাতে পেয়েছে ভিন্ন এক পরিচয়। এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী প্রতিমাটি দেখতে মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।

মাটির তৈরি প্রতিমার শরীরজুড়ে একের পর এক ম্যাচের কাঠি বসানো হচ্ছে। কোথাও পাশাপাশি, কোথাও নির্দিষ্ট নকশায়। এর সাথে যুক্ত হচ্ছে রেশমি সুতার সূক্ষ্ম কারুকাজ। এখনো শেষ হয়নি প্রতিমার কাজ। কাঠি ও সুতার কাজ শেষে দেওয়া হবে রঙের প্রলেপ। তখনই ফুটে উঠবে এর পূর্ণ সৌন্দর্য।

চারজন শিল্পী এক মাসের বেশি সময় ধরে প্রতিমাটি তৈরির কাজ করছেন। পূজা কমিটির হিসাবে, শুধু শিল্পীদের পারিশ্রমিক বাবদ ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সময় ও শ্রমের পাশাপাশি বিশেষ উপকরণ ব্যবহারের কারণে এবারের প্রতিমা তৈরির খরচও তুলনামূলক বেশি।

প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার বলেন, ‘২০২৩ সালে ভারতে গিয়ে একটি কারখানায় ম্যাচের কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজ শিখি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সাতক্ষীরায় নতুনভাবে কাজটি করার চেষ্টা করেছি। ২০২৬ সালের দুর্গাপূজায় আমরা চারটি প্রতিমা তৈরি করছি। এর মধ্যে ম্যাচের কাঠি ও রেশমি সুতার এই প্রতিমাটি আমাদের বিশেষ আকর্ষণ।’

ম্যাচের কাঠি ব্যবহারে আগুনের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও শিল্পীর দাবি, কাঠিগুলোতে বিশেষ ধরনের মেডিসিন প্রয়োগ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন বাতাসে থাকার কারণে কাঠিগুলোর বারুদের কার্যকারিতাও নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে প্রতিমাটিতে আগুন লাগার আশঙ্কা নেই বলে তাঁর দাবি।

এই নতুনত্বের ভাবনা অবশ্য ব্রহ্মরাজপুরের পূজা কমিটির জন্য নতুন নয়। গত বছর দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করতে তারা ধান দিয়ে প্রতিমা তৈরি করেছিল। ব্যতিক্রমী সেই প্রতিমা দেখতে পূজার কয়েক দিনজুড়ে দূরদূরান্ত থেকে ভিড় করেছিলেন মানুষ। সেই সাড়ার ধারাবাহিকতায় এবার আরও নতুন কিছু করার পরিকল্পনা নেয় কমিটি।

ব্রহ্মরাজপুর শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির ক্যাশিয়ার অমিত ঘোষ বলেন, ‘গত বছর ধানের প্রতিমা দেখতে প্রচুর মানুষ এসেছিলেন। সেখান থেকেই এবার কমিটি ও ভাস্করের সাথে আলোচনা করে ম্যাচের কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে প্রতিমা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমরা মনে করছি, এটি একটি ইউনিক আয়োজন।’

কাজের অগ্রগতি দেখতে প্রতিদিনই মণ্ডপে আসছেন স্থানীয় মানুষ। কারিগরদের হাতে কীভাবে একটি সাধারণ ম্যাচের কাঠি দেবীর অলংকারে পরিণত হচ্ছে, তা দেখতে আগ্রহী দর্শনার্থীরা মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। অনেকে বলছেন, গত বছরের ধানের প্রতিমার পর এবার ম্যাচের কাঠির প্রতিমা ব্রহ্মরাজপুরের পূজায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, ‘গত বছর ব্রহ্মরাজপুর ইউনিয়নের একটি পূজামণ্ডপে ধান দিয়ে প্রতিমা তৈরি হয়েছিল। এবার তারা আরও ভিন্ন আঙ্গিকে ম্যাচের কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরি করছে। আশা করছি, শুধু সাতক্ষীরা নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ এই প্রতিমা দেখতে আসবেন।’

শুধু ব্রহ্মরাজপুর নয়, জেলার বিভিন্ন মণ্ডপেই চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। মাটি, খড় ও বাঁশের প্রচলিত কাঠামোর পাশাপাশি প্রতিমার সাজসজ্জায় যোগ হচ্ছে নানা ধরনের শিল্পভাবনা। শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, দেবহাটা, আশাশুনি, তালা ও কলারোয়াসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন চোখে পড়ার মতো শিল্পীদের ব্যস্ততা।

প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয় বাঁশ ও কাঠের কাঠামো তৈরির মধ্য দিয়ে। এরপর খড় দিয়ে দেওয়া হয় অবয়বের আকৃতি। কয়েক ধাপে মাটির প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হয় শরীরের গড়ন। মাটি শুকিয়ে গেলে শুরু হয় মুখাবয়ব ও অলংকারের সূক্ষ্ম কাজ। সবশেষে রং ও সাজসজ্জায় পূর্ণতা পায় দেবীর রূপ। প্রতিটি ধাপেই শিল্পীদের প্রয়োজন হয় অভিজ্ঞতা, ধৈর্য ও নিখুঁত হাতের কাজ।

দুর্গাপূজাকে ঘিরে এই ব্যস্ততা শুধু ধর্মীয় আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিমা তৈরির সাথে যুক্ত মৃৎশিল্পী, বাঁশ ও কাঠের কারিগর, রংমিস্ত্রি এবং সাজসজ্জার কারিগরদেরও কয়েক মাসের কর্মসংস্থান তৈরি হয়। উপকরণের দাম ও শ্রমের ব্যয় বাড়লেও প্রতিমার মান ও সৌন্দর্যে কোনো ছাড় দিতে চান না শিল্পীরা।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলায় ৫০০টির বেশি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে প্যান্ডেল নির্মাণ, আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তার প্রস্তুতিও। পূজা কমিটির নেতারা আশা করছেন, প্রশাসনের সহযোগিতা ও মানুষের পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপন করা সম্ভব হবে।

একটি সাধারণ ম্যাচের কাঠি-যার মূল কাজ আগুন জ্বালানো। শিল্পীর হাতে সেই কাঠিই এখন হয়ে উঠছে দেবীর অলংকার। দেড় লাখের বেশি ম্যাচের কাঠি, ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা আর চার শিল্পীর এক মাসের বেশি শ্রমে ব্রহ্মরাজপুরে তৈরি হচ্ছে দুর্গার এক ব্যতিক্রমী রূপ।

রঙের শেষ আঁচড় পড়ার পর সেই রূপ কতটা বদলে যায়, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা। তবে তার আগেই নতুন এই প্রতিমা সাতক্ষীরার দুর্গোৎসবে তৈরি করেছে আলাদা কৌতূহল। যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে মিশেছে স্থানীয় কারুশিল্প, সৃজনশীলতা এবং নতুন কিছু করার আকাঙ্ক্ষা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...