
বিয়ের বাকি ছিল আর মাত্র দুই সপ্তাহ। লাল শাড়ি, নতুন সিঁদুরসহ বিয়ের প্রয়োজনীয় কেনাকাটাও শেষ হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের সেই আনন্দের প্রস্তুতি শেষ হওয়ার আগেই ডেঙ্গু কেড়ে নিল ২৫ বছর বয়সী বৃষ্টি ঘরামির জীবন। মৃত্যুর পরও হবু বর তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে শেষ বিদায় জানিয়েছেন।
গোপালগঞ্জের বৃষ্টি ঢাকার শ্যামলীতে অবস্থিত একটি ট্রমা সেন্টারে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় নয় মাস ধরে সেখানে কাজ করছিলেন তিনি। গত শুক্রবার তার মৃত্যু হয়।
বৃষ্টির মৃত্যুর বিষয়ে জানতে তার দেওয়া নম্বরে ফোন করা হলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বড়বোন। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে তিনি বলেন, ‘আমার বোন। আমার বোন আর নাই। ১৬ অক্টোবর বিয়ের দিন ছিল। সব কেনাকাটা শেষ। ডেঙ্গু বোনটাকে কেড়ে নিল।’
বৃষ্টির শেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, তার শরীরের তাপমাত্রা ১০৮ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠেছিল। পরে হিট স্ট্রোক হয়। পরিবারের অভিযোগ, ওই সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা যথাসময়ে করা হয়নি। তার ভাষ্য, ১০ থেকে ২০ মিনিট আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে হয়তো বৃষ্টিকে বাঁচানো সম্ভব হতো।
গোপালগঞ্জ নার্সিং ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করা বৃষ্টির হবু বরের বাড়ি পার্শ্ববর্তী টেকেরহাট এলাকায়। মৃত্যুর পর বৃষ্টির হবু বর তাকে সিঁদুর পরিয়ে দেন। ঢাকা থেকে মরদেহ গোপালগঞ্জে নেওয়ার সময় তার শ্বশুর-শাশুড়ি বিয়ের জন্য কেনা সব সামগ্রীও সঙ্গে নিয়ে যান।
বৃষ্টির বড়বোন বলেন, ‘বোনজামাই ওকে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছে। ঢাকা থেকে মরদেহ নিয়ে আসার পথে ওর শ্বশুর-শাশুড়ি বিয়ের সব জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে আসেন। বৃষ্টির চলে যাওয়া আমাদের শত জীবনের শোক হয়ে থাকবে। বিয়ে নিয়ে কত আশা ছিল, কত যে গল্প করত।’
পেশার প্রতি বৃষ্টির মমতা ও রোগীদের সঙ্গে তার আন্তরিকতারও নানা স্মৃতি রয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে এক দুর্ঘটনাকবলিত কিশোরীর আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার ছবি শেয়ার করে নিজের অনুভূতি তুলে ধরেছিলেন তিনি।
ওই পোস্টে বৃষ্টি লিখেছিলেন, মেয়েটি মারাত্মক দুর্ঘটনার পর কোনোমতে প্রাণে বেঁচে ফিরেছে। সুস্থ হতে তার কয়েক মাস, এমনকি এক বছরও লেগে যেতে পারে। রোগী তাকে ‘আপু’ বলে ডাকত এবং ডিউটি শেষে চলে যেতে দিতে চাইত না—সেই কথাও লিখেছিলেন বৃষ্টি।
রোগীর সঙ্গে নার্সের এমন সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি লিখেছিলেন, ‘এইটা সবাই বোঝে না শুধু নার্স আর রোগীর একান্ত মধ্যকার আলাপআলোচনা।’
বৃষ্টির সেই লেখাই যেন তার পেশার প্রতি ভালোবাসা ও রোগীদের প্রতি মমতার সাক্ষ্য হয়ে রয়ে গেছে। বিয়ের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও সহকর্মীদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক।