
একদিকে বাবার নিথর দেহ। ঘরজুড়ে স্বজনদের কান্না, শোক আর আহাজারি। অন্যদিকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক পরীক্ষা। এমন নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে অধিকাংশ মানুষই হয়ত ভেঙে পড়তেন। কিন্তু বাবার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার দৃঢ় প্রত্যয়ে চোখের জল লুকিয়ে পরীক্ষার হলে বসেছেন মেয়ে। নওগাঁর পত্নীতলার আয়েশা সিদ্দিকা মৌ-এর এই গল্প শুধু একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ঘটনা নয়; এটি শোককে শক্তিতে পরিণত করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত।
আজ বুধবার (২৯ জুলাই) অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষার জীববিজ্ঞান বিষয়ে নজিপুর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে অংশ নেন আয়েশা। তিনি পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফুসফুসজনিত রোগে মারা যান আয়েশার বাবা মিজানুর রহমান। মৃত্যুর খবর মুহূর্তেই পুরো পরিবারকে স্তব্ধ করে দেয়। যে বাবা মেয়ের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতেন, সেই বাবার মৃত্যুর শোক নিয়েই পরদিন সকালে অনুষ্ঠিত হয় তার জানাজা।
বুধবার সকাল ৯টায় পৈতৃক বাড়ি মঙ্গলবাড়ি গ্রামে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয় মিজানুর রহমানের। পরিবারের সদস্যরা তখনও শোকে মুহ্যমান। কিন্তু সবার একটাই কথা—বাবা কখনোই চাইতেন না মেয়ের পড়াশোনা থেমে যাক। সেই বিশ্বাস থেকেই পরিবারের পরামর্শে বাবার শেষ বিদায় জানিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে রওনা দেন আয়েশা।
মরহুম মিজানুর রহমান নজিপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাদ্রাসাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ধামইরহাট উপজেলার গাংরা ইসলামিয়া বালিকা আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়েছেন। বিদায়ের দিনে নিজের মেয়েও শিক্ষার সেই পথেই অবিচল থেকে বাবার স্বপ্নের প্রতি নীরব শ্রদ্ধা জানালেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শোকের এমন মুহূর্তে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। তবুও নিজের ভবিষ্যৎ এবং বাবার আজীবনের স্বপ্নকে সম্মান জানাতে আয়েশা যে মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন, তা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার হয়ে থাকবে।
পত্নীতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি। পরীক্ষার সময় একজন বাবাকে হারানো যে কতটা বেদনাদায়ক, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। একইসঙ্গে আয়েশা সিদ্দিকা মৌয়ের অসাধারণ মনোবল, দায়িত্ববোধ ও সচেতনতাকে আমি সম্মান জানাই। তার সঙ্গে দেখা করে খোঁজখবর নেব এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার পাশে থাকার চেষ্টা করব।