• শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪২ অপরাহ্ন
শিরোনাম

আজ বিশ্ব ফুসফুস দিবস

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সংবাদটি সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন...

প্রতি বছর ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব ফুসফুস দিবস। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস যেমন অপরিহার্য, তেমনি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়ার জন্য সুস্থ ফুসফুসও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফুসফুস শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দেওয়ার প্রধান অঙ্গ। অথচ ধূমপান, তামাক, বায়ুদূষণ, ঘরের ধোঁয়া, পেশাগত ঝুঁকি, সংক্রমণ ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে ফুসফুস প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে।

বিশ্ব ফুসফুস দিবসের উদ্দেশ্য হলো ফুসফুসের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো, শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ ও যথাযথ চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবন্ধক ফুসফুস রোগ বা সিওপিডি, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া ও ফুসফুসের ক্যানসার বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি।

২০২৬ সালে প্রকাশিত বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দীর্ঘস্থায়ী বাধাজনিত ফুসফুসের রোগ (সিওপিডি) বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। এটি বিশ্বে মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ এবং মোট বৈশ্বিক মৃত্যুর প্রায় ৬ শতাংশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
একই বছরে হাঁপানিতে আনুমানিক ৩৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ আক্রান্ত ছিলেন এবং এ রোগে প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শিশুদের মধ্যে হাঁপানি অন্যতম সাধারণ দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যা তাদের দৈনন্দিন জীবন ও শারীরিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে ফুসফুসের রোগের বোঝা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক। তাই ধূমপান ও তামাক বর্জন, বায়ুদূষণ কমানো, সংক্রমণ প্রতিরোধ, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে ফুসফুসের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে। কোষ সেই অক্সিজেন ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে। ফলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে গেলে শুধু শ্বাস-প্রশ্বাস নয়, হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, পেশি ও অন্য অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে।
সিগারেট, বিড়ি, চুরুট, হুক্কা ও অন্য তামাকজাত দ্রব্যের ধোঁয়া ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন ধূমপানের ফলে সিওপিডি, দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিস, এমফিসেমা ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। পরোক্ষ ধূমপানের ধোঁয়াও শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ক্ষতিকর। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প-কারখানার নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলা, সূক্ষ্ম কণিকা ও আবর্জনা পোড়ানোর ধোঁয়া শ্বাসতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে থাকলে শ্বাসকষ্ট ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কাঠ, কয়লা বা অন্য জ্বালানি দিয়ে রান্নার সময় পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে ঘরের ভেতর ক্ষতিকর ধোঁয়া জমে যায়। দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে থাকলে বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বাড়তে পারে। যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং অন্য ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ফুসফুসকে আক্রান্ত করতে পারে। কিছু সংক্রমণ দ্রুত চিকিৎসা না পেলে নিউমোনিয়া, শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতা বা অন্য গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
কিছু ফুসফুসের রোগ জিনগত বৈশিষ্ট্য বা পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। হাঁপানির ক্ষেত্রেও পারিবারিক প্রবণতা থাকতে পারে। বয়স, অ্যালার্জি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থাও শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।
ফুসফুসের রোগের লক্ষণ রোগভেদে আলাদা হতে পারে। তবে সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে— দীর্ঘস্থায়ী কাশি, কাশির সঙ্গে কফ, বারবার শ্বাসকষ্ট, হাঁটাচলা বা পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাওয়া, শ্বাসের সময় শোঁ শোঁ শব্দ,  বুক ভারী লাগা বা অস্বস্তি, বারবার শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা।
শিশুদের শ্বাসতন্ত্র তুলনামূলক সংবেদনশীল। তাই তাদের ধূমপানের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখা, ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা এবং বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নিশ্চিত করা জরুরি।
রান্নার ধোঁয়া, তামাকের ধোঁয়া ও বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ নারীদের শ্বাসতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা দিতে পারেন। যেমন— ১. বুকের এক্স-রে, ২. সিটি স্ক্যান, ৩. স্পাইরোমেট্রি, ৪. রক্ত পরীক্ষা, ৫. পালস অক্সিমেট্রি , ৬. রক্তের গ্যাস বিশ্লেষণ ৭. কফ বা থুতু পরীক্ষা, ৮. ব্রঙ্কোস্কপি।
প্রতিটি রোগীর জন্য সব পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরীক্ষা নির্বাচন করা উচিত।
ফুসফুসকে সুস্থ রাখতে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখা, অসুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখা এবং ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা দরকার।
অসুস্থ অবস্থায় অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকলে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং হাঁপানি বা সিওপিডিতে আক্রান্তদের বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এ সময়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে অবস্থান কমানো, ধুলাবালি ও ধোঁয়া এড়িয়ে চলা এবং দূষিত পরিবেশে দীর্ঘসময় অবস্থান না করা ভালো। ঘরের ভেতরেও ধোঁয়া, ধুলা ও অন্য দূষণকারী উপাদান কমানোর চেষ্টা করতে হবে।
নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম হৃদযন্ত্র, পেশি ও সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে। বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটা, সাইকেল চালানো বা অন্য ব্যায়াম করা যেতে পারে। তবে হাঁপানি, সিওপিডি, হৃদরোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগ
থাকলে ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা ভালো।
হাঁপানি, সিওপিডি বা অন্য কোনো দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়ম মেনে ব্যবহার করা জরুরি। উপসর্গ কমে গেলেই নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা ঠিক নয়। সব কাশি, সর্দি বা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে ভাইরাসজনিত সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণত কার্যকর নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই কাশি বা জ্বর হলেই নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দীর্ঘদিনের কাশি, জ্বর, রাতের বেলা ঘাম, দুর্বলতা ও অকারণে ওজন কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে যক্ষ্মার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। যক্ষ্মা শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পূর্ণ চিকিৎসা শেষ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধ মাঝপথে বন্ধ করলে চিকিৎসা ব্যর্থতা ও ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘদিনের ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। তবে শুধু ধূমপায়ীরাই আক্রান্ত হন— এমন ধারণা ঠিক নয়। বায়ুদূষণ, কর্মক্ষেত্রে কিছু ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শ এবং অন্য কারণও ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী কাশি, কাশির সঙ্গে রক্ত, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, বুকব্যথা বা দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্ট থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সাধারণ সর্দি-কাশির সময় পর্যাপ্ত পানি, উষ্ণ তরল, বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার আরাম দিতে পারে। মধু কিছু ক্ষেত্রে কাশির উপসর্গ কমাতে সহায়ক হতে পারে। লেবু, কমলা, পেয়ারা, শাকসবজি, মাছ, ডিম, বাদাম, রসুন, হলুদ বা গ্রিন টি পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা পানীয় ফুসফুস থেকে নিকোটিন বা দূষিত পদার্থ ‘পরিষ্কার’ করে— এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। এসব উপাদানকে কখনোই চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
ফুসফুসের সুস্থতা রক্ষার দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির নয়, পরিবারেরও। ঘরের ভেতর ধূমপান বন্ধ করা, রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা, শিশুদের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখা এবং অসুস্থ ব্যক্তির যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা— এসব ছোট পদক্ষেপ বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে পারে।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা করা হয়। একজন অভিজ্ঞ হোমিও চিকিৎসক রোগীর ইতিহাস, শারীরিক ও জেনেটিক অবস্থা বিবেচনা করে ওষুধ নির্বাচন করেন। পাশাপাশি সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ঘুম, ব্যায়াম, মানসিক চাপমুক্ত জীবনযাপন ও কাউন্সেলিংকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে যেসব ওষুধ লক্ষণের ওপর নির্ভর করে ব্যবহার করে থাকেন— চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনো নিজে নিজে ওষুধ গ্রহণ করবেন না।
হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট, ঠোঁট বা মুখ নীলচে হয়ে যাওয়া, তীব্র বুক ব্যথা, কাশির সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রক্ত, অস্বাভাবিক ঘোর বা বিভ্রান্তি অথবা উচ্চ জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
ফুসফুস আমাদের প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে জীবনকে সচল রাখে। কিন্তু ধূমপান, তামাক, বায়ুদূষণ, ঘরের ধোঁয়া, পেশাগত ঝুঁকি ও সংক্রমণের মতো কারণগুলো প্রতিনিয়ত এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে হুমকির মুখে ফেলছে। তাই ফুসফুস সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো ঝুঁকি কমানো, ধূমপান বর্জন, পরিচ্ছন্ন বাতাস নিশ্চিত করা, সংক্রমণ প্রতিরোধ, প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা নেওয়া। বিশ্ব ফুসফুস দিবসের অঙ্গীকার হোক— শুধু আজ নয়, প্রতিদিনই ফুসফুসের যত্ন। কারণ নিরাপদ শ্বাসই সুস্থ জীবনের অন্যতম ভিত্তি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...