
স্কুলশিক্ষিকা স্ত্রীর বিরুদ্ধে অর্ধকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন প্রবাসী স্বামী মনির হোসেন চৌধুরী। তার অভিযোগ, প্রবাস জীবনে কষ্টার্জিত ৪৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন তার সাবেক স্ত্রী নাসরিন সুলতানা। তিনি বলেন, ১৫৩ নম্বর বেগম শামসুন্নাহার শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তারিকুল ইসলামের সঙ্গে নাসরিন সুলতানার পরকীয়া সম্পর্ক রয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বেলা ১১টায় বরিশাল প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী প্রবাসী মনির হোসেন চৌধুরী। এ সময় স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিকের সাবেক স্ত্রীও ছিলেন প্রেস ক্লাবে।
মনির হোসেন জানান, অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় করা মামলার তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (পিবিআই) আদালতে দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। সোমবার (২ নভেম্বর) তারা দুজন আদালতে হাজির হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অভিযুক্ত দুজনই পেশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মনির জানান, ২০১২ সালের ৪ ডিসেম্বর নাসরিন সুলতানাকে বিয়ে করেন তিনি। সংসারে তাদের এক ছেলে ও এক মেয়েও রয়েছে। ২০০২ সাল থেকে সৌদি আরবে কর্মরত তিনি। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ নিয়মিত দেশে পাঠাতেন স্ত্রী-সন্তানদের ভরণপোষণ, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সংসারের উন্নতির জন্য।
দীর্ঘদিনের দাম্পত্য বিশ্বাস থেকে নিজের উপার্জনের বড় অংশ স্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছেন। এমনকি সাত লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫৩ নম্বর বেগম শামসুন্নাহার শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্ত্রীকে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির ব্যবস্থা করে দেন বলেও দাবি করেন মনির।
তার অভিযোগ, চাকরিতে যোগদানের পর একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তারিকুল ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় নাসরিনের। একপর্যায়ে বরিশাল নগরীতে বাসা ভাড়া নিয়ে তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বসবাস শুরু করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে তারিকুলকে ভোলায় বদলি করা হয়। কিন্তু তাতেও তাদের পরকীয়া সম্পর্কের অবসান ঘটেনি।
দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শেষ চেষ্টাও করেছিলেন মনির। ২০২৪ সালের ২২ মার্চ স্ত্রীকে সৌদি আরবে নিয়ে ওমরা পালন করান। পবিত্র কাবা শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে স্ত্রী পরকীয়া সম্পর্ক থেকে সরে আসার শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু দেশে ফিরে সেই আগের অবৈধ সম্পর্কই টিকিয়ে রাখেন তিনি।
মনির অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের ১৬ জুন সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার সময় ১১ ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের বার নিয়ে আসেন তিনি। ওই সময় স্বর্ণের বারটির বাজারমূল্য ছিল ২৮ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। স্ত্রীর পরামর্শে ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাদের নামে জমি কেনার উদ্দেশ্যে স্বর্ণের বারটি বিক্রি করতে সম্মতি দেন। কিন্তু সন্তানদের নামে জমি না কিনে স্ত্রী ও তার ভাইয়ের নামে জমি কেনা হয়। জমির দলিলে মূল্য পাঁচ লাখ টাকা দেখিয়ে অবশিষ্ট অর্থ আত্মসাৎ করেন তারা।
এছাড়া বিভিন্ন সময়ে স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে পাঠানো অর্থ, বাসা ভাড়া বাবদ দেওয়া টাকা এবং ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর নগদ ১৫ লাখ ৪১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে স্বর্ণালংকার কিনে দেওয়ার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন প্রবাসী মনির হোসেন চৌধুরী।
তার দাবি, তারিকুল ইসলামের সঙ্গে সাবেক স্ত্রীর কথিত সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তাঁদের সংসারে অশান্তি বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি নাসরিন নগদ এক লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান। একই দিন তাকে তালাকের নোটিশ পাঠানো হয়।
মনিরের অভিযোগ, সাবেক স্ত্রী নাসরিন সুলতানা ও তারিকুল ইসলামের যোগসাজশে তার মোট ৪৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছে। পাশাপাশি স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য সম্পদেরও কোনো সুষ্ঠু হিসাব তাকে বুঝিয়ে দেয়নি।
অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে আদালতে মামলা করেন মনির হোসেন। আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেন পিবিআইকে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১৪ সেপ্টেম্বর পিবিআইয়ের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. রহিম অভিযুক্ত নাসরিন সুলতানা ও তারিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
সর্বশেষ গত ২ নভেম্বর বরিশাল সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে তরিকুলের সাথে বিচ্ছেদ ঘটে তার প্রথম স্ত্রীর। সেই ঘরেও রয়েছে একটি কন্যা সন্তান।
সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত মনির হোসেন প্রবাসে জীবনে তার কষ্টার্জিত অর্থ ও গড়ে তোলা সম্পদের সঠিক হিসাব ও ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে চান। একই সঙ্গে দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ যেন কোনোভাবেই অনিশ্চয়তার মুখে না পড়ে, সে বিষয়েও সুষ্ঠু বিচার দাবি তার।