গত কয়েকদিনের টানা জোয়ার ও উত্তাল ঢেউয়ে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। জোয়ারের পানি আগের তুলনায় অনেক ভেতরে উঠে আসায় সৈকতের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে ভাঙনও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। কুয়াকাটা সৈকতের একমাত্র ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্স এখন সমুদ্রে বিলীনের অপেক্ষায়।
“আর দু-একদিন বালুক্ষয় অব্যাহত থাকলে পুলিশ বক্সটি সমুদ্রে চলে যাবে। ইতোমধ্যে আশেপাশের অংশ সমুদ্রে চলে গেছে। সমুদ্র উত্তাল হলেই আতঙ্কে থাকি, কখন শেষ অংশটুকুও ধসে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মেরামত ও সংরক্ষণের বিষয়ে কথা বলেও কোনও ব্যবস্থা না হওয়ায় পুলিশ বক্সের সকল মালামাল অফিসে নিয়ে রেখেছি। ঝুঁকির মধ্যেও রোদ, বর্ষা উপেক্ষা করে পর্যটকদের সেবা দিচ্ছি।”
এভাবেই গণমাধ্যমকর্মীদের বলছিলেন ট্যুরিস্ট পুলিশের কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ নাজমুল আহসান।
পটুয়াখালীর পর্যটননগরী কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের ভাঙন এখন আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। পূর্ণিমার জোয়ার, বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে প্রতিদিনই সৈকতের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বালু সরে যাচ্ছে। এতে জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন ট্যুরিস্ট পুলিশের একমাত্র পুলিশ বক্সটিও সমুদ্রে বিলীনের পথে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও পর্যটন অবকাঠামো রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জিরো পয়েন্টের অস্থায়ী পুলিশ বক্সটির নিচের মাটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে ধসে গেছে। ফলে শুধু পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তাই নয়, পর্যটকদের চলাচল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর ধরেই কুয়াকাটা সৈকতের বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিলেও চলতি সময়ের পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি ভয়াবহ। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এখানে ভিড় করেন। সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পর্যটন, ধর্মীয় ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি কুয়াকাটার ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জোয়ারের সময় ঢেউ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ভেতরে চলে আসছে। কয়েক মাস আগেও যেসব স্থানে পর্যটকেরা স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতেন, সেখানে এখন বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। মসজিদ, মন্দির ও পুলিশ বক্সের কাছাকাছি পর্যন্ত পানি চলে আসায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না নিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটন অবকাঠামোও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
কুয়াকাটা ভ্রমণে আসা পর্যটক রুবায়েদ ফেরদৌস বলেন, “কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে সৈকতের ভাঙনের দৃশ্য দেখে হতাশ হয়েছি। দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রের এমন পরিস্থিতি পর্যটকদের জন্যও উদ্বেগের। সৈকতের সৌন্দর্য ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর টেকসই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
কুয়াকাটা শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির তীর্থযাত্রী সেবাশ্রমের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী নিহার রঞ্জন মণ্ডল বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ড গত কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। কুয়াকাটার মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও ধর্মীয় এলাকায় স্থায়ী উপকূল সুরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি।”
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক) এর সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, গত এক দশকে কুয়াকাটাকে ঘিরে শত শত কোটি টাকার বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে। হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, ট্রাভেল এজেন্সিসহ বিভিন্ন পর্যটনসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সৈকতের ভাঙন ও পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বার্তা ছড়িয়ে পড়লে পুরো পর্যটনশিল্প ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই কুয়াকাটার টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে দ্রুত বড় পরিসরের উপকূল সুরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম ভূঁইয়া বলেন, “কুয়াকাটায় কাজ করতে গিয়ে অনেক ঝামেলা হয়, ইমার্জেন্সি কাজ করতে গেলে সাধারণ মানুষ বস্তায় দেওয়া বালু নিয়ে প্রশ্ন করে। আমরা সাপ্লাই বস্তা দেওয়ার চেষ্টা করছি। যাতে ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্সটি রক্ষা করা যায়, আপাতত দুই-একদিনের মধ্যে সেই কাজটা আমরা করব।”
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব মো. আরিফুজ্জামান বলেন, “ইতোমধ্যে একটি স্পন্সর কোম্পানির সাথে কথা হয়েছে, যেটা বিলীন হচ্ছে তার পাশে আর একটি তৈরি করে দেবে।”